ঢাকা , শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫ , ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
সংবাদ শিরোনাম
ঈদের আগে বেতন-বোনাস পেয়ে স্বস্তিতে সাড়ে ৩ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক ঈদযাত্রায় সদরঘাটে চিরচেনা ভিড় মিয়ানমারে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহায়তা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার চীনের ব্যাপক আকারে চীনের বিনিয়োগ আসবে, আশা প্রেস সচিবের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনায় বেইজিংয়ের কাছে ‘মাস্টারপ্ল্যান’ চায় ঢাকা ঢাকা-বেইজিংয়ের মধ্যে ৯ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই ডাকাতি বৃদ্ধিতে উদ্বেগ নিরাপত্তা দাবি স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সুনামগঞ্জে বালু উত্তোলন নিয়ে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষ আহত ৬ নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান সংস্কারের কথা বলেও পরে কথা রাখেনি- নাহিদ ঈদে ফিরতি যাত্রায় ৮ এপ্রিলের টিকিট মিলবে আজ মিয়ানমারে দু’দফা শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপল বাংলাদেশও পানি সঙ্কটে উত্তরাঞ্চলের কৃষি বাংলাদেশে কারখানা স্থানান্তরে সহায়তা করবে চীনা এক্সিম ব্যাংক ভারত থেকে কেনা হবে আরও ৫০ হাজার টন চাল ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নে তিন স্তরের নিরাপত্তা ২৬ দিনে রেমিট্যান্স এলো প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ঈদের ছুটি দীর্ঘ হলেও অর্থনীতিতে স্থবিরতা আসবে না-অর্থ উপদেষ্টা মিয়ানমারে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে রোহিঙ্গারা নাড়ির টানে ছুটছে মানুষ রাজধানীতে তীব্র যানজট
​গল্প

আলেয়া

  • আপলোড সময় : ২৯-০৮-২০২৪ ১২:৪০:৩৭ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৯-০৮-২০২৪ ১২:৪০:৩৭ অপরাহ্ন
আলেয়া
গৌতম বিশ্বাস
বকুল বলেছিল, ‘তোমার জামাইয়ের বড্ড হাতটান চলছে বাবা। খেতের ফসল খেতেই রয়ে গেল। একমুঠো ধানও জলের তলা থেকে তুলতে পারলো না মানুষটা। কি খাই কি না খাই। তুমি যদি ছিদাম কাকাকে দিয়ে এক বস্তা ধান পাঠাতে।’
শেষের কথাগুলো অনুনয়ের সুরে বলেছিল বকুল। আর তা শুনে ভেতরটা ভিজে উঠেছিল সুধন্য বিশ্বাসের। তিন তিনটে ছেলের পরে ওই একটাই মেয়ে তার। এজন্যে ছোটবেলা থেকেই একটু বুঝি বেশি আদর সোহাগে মানুষ করেছিলেন বিশ্বাস মশাই। আর কেবলই বলতেন, ‘মা আমার ঘরের লক্ষ্মী। যে ঘরে যাবে ধনে মানে উপচে পড়বে সেই ঘর।’
বিয়ের পরে অবশ্য তেমনটা হয়নি মোটেই। বাবার এক ছেলে। বিষয় সম্পত্তি আছে শুনে একটু তাড়াহুড়ো করেই বিয়েটা দিয়েছিলেন সুধন্য বিশ্বাস। ঘটক বলেছিল, ‘ওসব নিয়ে ভাববেন না বিশ্বাস মশাই। এমন ছেলে লাখে একটা মেলে। ওই সংসারে গেলে মেয়ে আপনার সুখেই থাকবে।’
সুধন্য বিশ্বাসের মনে যেটুকুও যা খুতখুতানি ছিল তা সরে গিয়েছিল ঘটকের কথায়। তবু বলেছিলেন, ঠিক বলছো তো ঘটক? ওই একটিই মেয়ে আমার। ছোট থেকেই আদর সোহাগে মানুষ করেছি। এ মেয়ে অসুখী থাকলে আমি সুখ পাবো না।’
ঘটক বলেছিল, ‘এই নারান ঘটক কখনও মিথ্যে বলে বিয়ে দেয় না বিশ্বাস মশাই।’
‘তাইতো তোমার কথায় ভরসা রেখে বিয়েটা দিচ্ছি। দেখো, মেয়ে যেন আমার সুখে থাকে।’
তা মেয়ে যে কেমন সুখে আছে তা এখন বেশ বুঝতে পারেন সুধন্য বিশ্বাস। মেয়ে আজ এটা চাইছে। কাল ওটা চাইছে। তা কোনোটাই যে মেয়ের চাওয়া নয় তা বেশ বুঝতে পারেন তিনি। আর তাই মাঝে মধ্যেই বলেন, ‘ভুলটা আমিই করেছি রে মা। আর একটু খোঁজ-খবর নিয়ে যদি বিয়েটা দিতাম।’
মেয়ে মাথা নিচু করে বাবার কথা শোনে। আর দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে। কিন্তু সুধন্য বিশ্বাস পারেন না। বুকের ভেতরটাকে চিরে দিয়ে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসটা বাইরে ছেড়ে দিয়ে মেয়ের দিকে তাকান। একটু যেন খুঁজে পেতে চান মেয়ের সেই ছোটবেলার হাসি হাসি মুখ। কাজল পরা চোখ। পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো মাথা।
তা মেয়ে ধান পাঠানোর কথা বললে বিশ্বাস মশাই বলেছিলেন, ‘অমন করে বলিস নে মা।  কয় বস্তা পাঠাতে হবে বল।’
বকুল বলেছিল, ‘সে তুমি যতটা পারো।’
সুধন্য বিশ্বাসের বিষয় সম্পত্তি যা আছে অমন মেয়ে জামাইকে তিনি বসিয়ে খাওয়াতে পারেন। দেওয়া থোয়ায় তাই কিছু আপত্তি নেই তার। থাকবেই বা কেন? ছেলে তিনটে যেমন তার। তেমনি মেয়েও তো তার।
মেয়ের কথা শুনেই তাই হাঁক দিয়েছিলেন, ‘ছিদামÑ’।
সুধন্য বিশ্বাসের বাবা রাখোহরি বিশ্বাসের আমল থেকেই বিশ্বাস বাড়িতে আছে ছিদাম। সেই কোন ছোটবেলায় এসে উঠেছিল এ বাড়িতে আর এখন এই বয়সে এসেও সে এ বাড়িতেই আছে। দিনে দিনে কবে যেন এ বাড়িরই একজন হয়ে গেছে। এসেছিলো গোরু বাছুরের বাগাল হিসাবে। দিনে দিনে কাজের পরিধি বেড়েছে তার। সুধন্য বিশ্বাসের জমিজমা অনেক। সারা বছর একটা না একটা ফসল উঠতেই আছে। গোয়াল ভর্তি গরু বিশ্বাসের। তাদের দেখাশোনা সবটাই ছিদামের ওপর। তাছাড়া দূরের মাঠ থেকে গোরুর গাড়িতে চাপিয়ে ফসল এনে খামারে তোলা। হাটে বেচতে যাওয়া। বাড়ির বাইরে গেলে বিশ্বাসের পাশে পাশে থাকা। সবখানেই ছিদাম। বিশ্বাস মশাই বড়ো ভরসা করেন ছিদাম কে।
তো হাঁক কানে যেতেই হাতের কাজ ফেলে ছুটে এসেছিল ছিদাম, ‘হ্যাঁ দাদা।’
‘একবার যে কুসুমতলা যেতে হয় তোর।’
‘ কুসুমতলা? মানে বকুল মামনির বাড়ি?’
‘হ্যাঁ রে।’
‘তা সে তো ম্যালা দূরের পথ। এখন এই অবেলায়Ñ।’
সুধন্য বিশ্বাস বলেছিলেন, ‘তোর সব তাতেই তাড়াহুড়ো। এই এখনই তোকে কে যেতে বলছে শুনি?’
‘তাহলে?’
‘কাল পরশুর মধ্যে গেলেই হল।’
ছিদাম জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কিছু নিয়ে যেতে হবে বুঝি?’
‘ তা না হলে তোকেই বা বলবো কেন?’
দিন তিনেকের মাথায় ছিদাম চলেছে সেই কুসুমতলা। অনেকটা দূরের পথ ই বটে। সেই সকাল সকাল চাট্টি খেয়ে বেরিয়েছিল। আর এখন যাকে বলে ভর দুপুর। মাথার উপর চোত মাসের রোদ। নিচে আগুন ঢালা মাটি। না সেই মাটিতে পা ফেলে অবশ্য হাঁটতে হচ্ছে না ছিদামের। ছিদাম চলছে গরুর গাড়িতে। এ গাড়িতে সে গাড়োয়ান। আবার সে-ই যাত্রী। গাড়ি অবশ্য ফাঁকা নেই। বাঁশের মাচালে দশ বস্তা ধান। এই ধান ছিদাম নিয়ে চলেছে কুসুমতলা। অর্ধেকের সামান্য বেশি পথ-ই বুঝি পেরোতে পেরেছে এতক্ষণে। সামনে আরও অনেকটাই পথ বাকি। এরমধ্যে গরু দু’টোকে বার দুয়েক জিরেন দিয়েছে সে। এখন আরও একবার জিরেন চাইছে ওরা। মাঝেমধ্যে ঘাড় বাঁকিয়ে জানানও দিতে চাইছে তা। কিন্তু ছিদামের সেই একই কথা, ‘জিরোস বাপ, জিরোস। আর খানিক পথ এগো। দিনমানে পৌঁছোতে হবে যে।’
বলছে বটে তবে জিরেন নিতে ইচ্ছে হচ্ছে নিজেরও। মাথার ওপরের ঝাঁ ঝাঁ  রোদে ব্রহ্মতালু জ্বলতে শুরু করেছে। এমনই আকাশ যে এক ফোঁটা মেঘ নেই কোথাও। তা না থাকে না থাক, টুকুন বাতাসও তো বইতে পারতো। ছিদাম বসে আছে তাই এই। আর গরু দুটো তো  -
‘ হ্যাট, হ্যাট, হুইÑইÑ’।
গোরু দুটোকে আর একটু পা চালিয়ে হাঁটতে বলল ছিদাম। গাড়ি এখন চলছে ফাঁকা মাঠের ভেতর দিয়ে। বেশ বড়ো মাঠটার মাঝখান দিয়ে বার দুই সামান্য বাঁক নিয়ে সোজা দক্ষিণে চলে গেছে রাস্তাটা। মাটির রাস্তা। ইট অবশ্য পড়েছিল কোনও কালে। কিন্তু আজ আর তার অস্তিত্ব বলতে গেলে চোখেই পড়ে না। অসমান রাস্তায় ‘ক্যাচোর ক্যাচ’ শব্দ তুলে চলছে গাড়ি। গরুর খুরে খুরেও শব্দ উঠছে, ‘খটার খট’।
ঘাড় কাত করে একবার আকাশের দিকে তাকালো ছিদাম। নিষ্ফলা আকাশটা রাগী রাগী চোখ নিয়ে ছিদামের দিকে চেয়ে আছে যেন। একফোঁটা মেঘের চিহ্ন নেই কোথাও। কেবল রোদ আর রোদ। সেই রোদ ডানায় মেখে অনেকটা উপরে দুটো চিল পাশাপাশি উড়ছে। সেদিকে তাকাতে গিয়ে চোখ যেন ঝলসে গেল ছিদামের। অগত্যা নামিয়ে আনলো চোখ দু’টো।
মাঠটা পেরোতে এখনও মিনিট কুড়ি চলতে হবে তাদের। কাছেপিঠে আর বাড়িঘর নেই। আর না কোনও গাছপালা, যেখানে দাঁড়িয়ে খানিক জিরিয়ে নিতে পারে। দুই পাশে ধানখেত। ধান রোয়া জমি থেকে বেশ একটা সোঁদা গন্ধ উঠে আসছে। গন্ধটা বড়ো ভালো লাগে ছিদামের। এমন গন্ধ পেলে সে বুক ভরে শ্বাস নেয়। এখনও নিল। তাতে মন জুড়োলেও শরীর জুড়োলো না। সারা শরীরে যেন আগুন জ্বলছে তার। সেই আগুনে কেবল সে পুড়ছে না, পুড়ছে গরু দু’টোও। যতই পা চালিয়ে হাঁটুক তারা তাতে মন ভরছে না ছিদামের। থেকে থেকেই তাই লাঠির বাড়ি মারছে পিঠে।
পাশ দিয়ে মাঝ বয়সি একটা লোক মাথায় ঘাসের আটি নিয়ে হেঁটে গেল। যেতে যেতে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ছিদামকে দেখলো বুঝিবা। আসলে আজকাল গরুর গাড়ি খুব একটা দেখা যায় না। বছর কয়েক আগেও মাঠ থেকে ফসল তোলা, সে ফসল নিয়ে হাটে যাওয়াÑ  সবেতেই ছিল গোরুর গাড়ি। ইঞ্জিন ভ্যান এসে গরুর গাড়ির দরকার ফুরিয়ে গেছে। কেবল ঐতিহ্য হিসেবে এখনও কেউ কেউ ধরে রেখেছে তা। সুধন্য বিশ্বাসও তেমনি। তাঁর একই কথা, ‘বাপ ঠাকুর্দার সময়ের জিনিস ছাড়তে বড়ো মায়া হয় যে।’
একঝাঁক দমকা বাতাস বয়ে যেতেই চোখে মুখে যেন আগুনের হলকা লাগলো। চোখ মুখের চামড়া জ্বলে গেল তাতে। ফের একবার গরু দুটোকে দ্রুত হাঁটার জন্য তাড়া দিল ছিদাম।
চোত মাসের দুপুর হলেও মাঠটাকে দেখতে বড়ো ভালো লাগছে ছিদামের। ওই দূরে আকাশ যেখানে দিগন্তে মিশেছে তা থেকে আর এই রাস্তা পর্যন্ত কেবল খেত আর খেত। কত ফসল তাতে। ধানখেতের সোঁদা জলজ গন্ধ ছাড়াও মাঝেমাঝেই এক অন্যরকমের মেঠো গন্ধ পাচ্ছে ছিদাম। এসব গন্ধ ছিদামের বড়োই চেনা। আজন্ম সে তো মাটি আর মাঠেরই মানুষ। হয়তোবা অন্যের বাড়িতে থাকে তবু তো এই মাটি, মাঠ, আর ফসলের সাথেই তার বসবাস।
চলতে চলতে কেমন একটা ঘোর যেন পেয়ে গেল ছিদামের। অনেকদিন পরে ফের সেই মুখটা মনে পড়ে গেল। এই পথ দিয়েই এমনই এক গোরুর গাড়িতে চেপে তার বাপের বাড়িতে গিয়েছিল ছিদাম। একবার, হ্যাঁ, মাত্র একবারই গিয়েছিল সে। মাত্রই তো ক’দিনের সংসার। তারপর আচমকা কোথায় যে চলে গেল সে। খোঁজ নিতে ছিদামের শ্বশুরবাড়িতে লোক পাঠিয়েছিলেন রাখোহরি বিশ্বাস। সে ফিরে এসে জানিয়েছিল, ‘না বাবু, কোনও খবর পেলাম না। তবে আমার কি মনে হয় জানেন? ওরা সব জানে।’
রাখহরি বিশ্বাস জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোর এমন মনে হল কেন?’
‘ছিদাম দা’র শ্বশুর বার বার করে একটা কথাই বলছিলো। বলছিলো, যে মানুষ অন্যের বাড়িতে থাকে, নিজের কোনও ঘর-সংসার নেই কোনও মেয়েই কি থাকে তার সঙ্গে?’
‘এই কথা বললো?’
‘ হ্যাঁ।’
‘যাক গে। ছিদামকে আমি আবার বিয়ে দেবো। দেখি বৌ থাকে কিনা।
না, নতুন করে আর ঘর বাঁধতে চায়নি ছিদাম। সে বলেছিল, ‘না গো বাবু, নতুন করে আর কারও সঙ্গে বাঁধা পড়তে চাই নে।’
‘কিন্তু এভাবে যে জীবন চলে না রে ছিদাম।’
‘কেন চলবে না বাবু?’
‘ওরে, জীবনে যে আপন একজন কেউ থাকতে হয়। যে সুখে দুঃখে তোর পাশে থাকবে। সময় অসময়ে দুটো কথা বলবে।’
‘আপনারা কী আমার পর বাবু?’
না, ছিদামের মুখে এমন কথা শুনে আর এগোতে পারেন নি রাখোহরি বিশ্বাস। ছিদামও নতুন করে আর বাঁধা পড়েনি কারও সঙ্গে।
ঘোরের মধ্য দিয়ে কখন যে মাঠ টা পেরিয়ে এসেছে টেরও পায়নি ছিদাম। আচমকা গোটা কতক ছেলেপেলের হৈ চিৎকারে ঘোর কেটে গেলে দেখতে পেল মাঠ পেরিয়ে গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। গ্রাম মানে গ্রাম। এই ভর চৈত্রেও যার চারদিকে কেবল গাছেদের ছায়া। সেই ছায়া ছুঁয়ে বইতে থাকা বাতাসের গায়ে বেশ একটা নরম শরম অনুভূতি। চোখ দুটো যেন বুঁজে আসতে চাইলো ছিদামের।
এতবড়ো মাঠটা রোদের মধ্যে দিয়ে পেরিয়ে গোরু দুটোও হাঁপিয়ে গেছে বেশ। খানিক ছায়া পেতে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়লো দুটোই। না, হাঁটার জন্য তাদের আর তাগাদা দিল না ছিদাম। কেবল জিজ্ঞেস করলো, ‘কী রে, দাঁড়ায়ে পড়লি যে?’
কোনও সাড়া দিল না অবলা জীব দুটো। কেবল এক দমকা দক্ষিণের বাতাস এসে ছুঁয়ে দিয়ে গেল ছিদামের কান, মুখ। যেন গোরু দুটোর হয়েই বলে গেল কিছু।
লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়লো ছিদাম। নামতে গিয়ে টের পেল শরীর জুড়ে কেমন একটা জড়তা কাজ করতে শুরু করেছে। মাথার মধ্যেও যেন কেমন একটা অসাড় অনুভূতি। নিঃশ্বাসে আড়ষ্টতা।
এমনটা লাগছে কেন? ভাবলো ছিদাম। পরক্ষণেই গরুর ‘হাম্বা’ ডাকে ভাবনাটা ভেঙে গেল তার। ওদের নির্ঘাত তেষ্টা পেয়েছে। না পেয়ে কি উপায় আছে আর। এতখানি পথ পেরিয়ে এলো এই রোদ-জ্বলা দুপুর পাড়ি দিয়ে। গলা তো শুকিয়ে যাওয়ারই কথা। ছিদামের নিজের গলাতেও তো কেমন একটা কেঠো অনুভূতি।
একটু দূরপথে যেতে হলে সঙ্গে একটা বালতি নিয়ে যায় ছিদাম। গরুকে জল খাওয়াতে হলে ওই বালতিতে জল এনে খাওয়ায়। এখনও তাই করলো সে। গাড়ির মাচালের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা বালতিটা খুলে নিয়ে চলে গেল জল আনতে। খানিক তফাতে পঞ্চায়েত থেকে বসানো সরকারি টিউবওয়েল। অন্য সময় হলে জল নেওয়ার জন্য দু’একজন থাকতো হয়তো। এখন এই ভরদুপুরে পুরোই ফাঁকা। ফাঁকা কলপাড় জুড়ে অখণ্ড এক ছায়ার দখল। চারপাশে বেশ একটা মন ভালো করা শীতলতা। কলের মুখে হাত লাগিয়ে জল খেল ছিদাম। গলার কেঠো অনুভূতি পুরোটাই সরলো তাতে। কিন্তু মাথার ভেতরটা আরও যেন অসাড় হয়ে এলো। শরীর খারাপ হলো নাকি ছিদামের?
ভাবতে ভাবতে বালতি ভরে জল এনে গরুর সামনে দিল ছিদাম।  এক, দুই, তিন। পুরো ছয় বালতি জল শেষ করে গরু দুটো যখন তৃপ্তির মাথা নাড়লো ততোক্ষণে ছিদামের শরীর জুড়ে গভীর একটা অসাড়তার সুস্পষ্ট উপস্থিতি। শরীরটা যে ঈষৎ  বিরাম চাইছে বেশ বুঝতে পারলো ছিদাম।
মাথার ওপর বড়োসড়ো এক শিরীষ চটকার ছায়া। ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁক দিয়ে অল্প সল্প রোদ নেমে আসছে সরু রেখার মতো। তার গায়ে অবশ্য এতোটুকু খরতা নেই। সবটুকু শুষে নিয়েছে চারপাশের ছায়ারা।সরু সরু সেই ফাঁক দিয়ে সূর্যটাকে একবার দেখার চেষ্টা করলো ছিদাম। সূর্য এখন আর খাড়াখাড়ি মাথার উপর নেই। হেলতে শুরু করেছে। বেলাবেলি পৌঁছোতে হলে এখনই ফের গাড়ি ছাড়া দরকার। মন চাইলেও শরীর চাইছে না তা। অগত্যা খানিক বসে যাওয়াই মনস্থির করলো সে।
শিরীষ চটকার মোটা গুড়ির সাথে শরীরটাকে হেলান দিয়ে বসলো ছিদাম। মুহূর্তে একরাশ দক্ষিণের নরম হয় এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার উপর। তাতে কখন যে চোখ দুটো বুঁজে এলো ছিদামের তা টেরও পেল না ছিদাম।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল ছিদাম? কার যেন ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে চোখ মেলতেই দেখতে পেল দিনের আলো ফুরোতে শুরু করেছে। গাঢ় হতে শুরু করেছে চারপাশের ছায়ারা। কলতলায় জল নিতে আসা গ্রাম্য মেয়ে বৌ দের ভীড়। ডালে ডালে অসংখ্য পাখির কিচিরমিচির।
‘ইস,  গা দেহি পুড়্যে যায়। তা কোথ্যিকে আইছো? যাবা কই?’
ছিদামের কপালে হাত রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলো মেয়ে মানুষটা। এমন দূর গাঁয়ে এমন মমতায় কে হাত রাখলো তার কপালে? অবাক হয়ে মুখটাকে দেখার চেষ্টা করলো ছিদাম। আর অমনি চমকে উঠলো যেন। চোখের সামনে থাকা ধূসর পর্দা টা একটু একটু করে সরে যেতে শুরু করলে ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করলো মুখটা। হ্যাঁ, সেই চেনা মুখ। চেনা চোখ। নাকের পাশে উঁচু হয়ে থাকা সেই ছোট্ট তিলটা পর্যন্ত।
‘কী হল? দ্যাহো কী?’
উত্তর দিতে গিয়েও পারলো না ছিদাম। তার চোখ থেকে সরে যাওয়া ধূসর পর্দার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুখখানির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল এক চির অখণ্ড নিদ্রায় আচ্ছন্ন হতে শুরু করেছে সে।
ফের একবার আস্তে আস্তে চোখ দুটো বুঁজে এলো ছিদামের।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে মানুষটা সত্যি, নাকি নিছকই কল্পনা তা জানতেও পারলো না ছিদাম।

নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য

সর্বশেষ সংবাদ